এনজিওর ঋণের কিস্তি চাপে অসহায় নিন্ম আয়ের মানুষ জন

প্রকাশিত: ৭:৩৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ২১, ২০২০

এনজিওর ঋণের কিস্তি চাপে অসহায় নিন্ম আয়ের মানুষ জন

 

শহিদুল ইসলাম সুইট নওগাঁ জেলা প্রতিনিধিঃ

ক্ষুদ্রঋণের নিয়ন্ত্রক সংস্থা রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) করোনা পরিস্থিতির কারণে সারাদেশে এনজিও ঋণের কিস্তি ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিথিল করে প্রজ্ঞাপণ জারি করেছে।কিন্তু নওগাঁর নিয়ামতপুরে এই নির্দেশনা কার্যকারিতার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না ।
বাড়ছে ক্ষুদ্রঋণ আদায়ের চাপ। আর এতে বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষেরা।
উপজেলায় বিভিন্ন ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারি ও অন্যান্য এনজিওগুলো যেমন- আরডিআরএস বাংলাদেশ, রিক, কার্ব, মৌসুমী, ব্রাক, আশা, ব্যুরো বাংলাদেশ, গ্রামীণ ব্যাংক, দাবী, প্রয়াস, ছাতড়া সমিতি, আশ্রয়সহ দৈনিক আদায়ের মাল্টিপারপাস কোম্পানী যেমন নওগাঁ মাল্টিপারপাস, ঢাকা মাল্টিপারপাস কোম্পানী, বরেন্দ্র, মৌসুমী ইত্যাদি সংস্থাগুলো তাদের ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি আদায়ের চাপ শুরু করে দিয়েছেন। এনজিওগুলো তাদের দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক ঋণ (কিস্তি) আদায় চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।

লকডাউনে যেখানে তিন বেলা খাবার জোটে না সেখানে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা এনজিও ও সুদ কারবারিরা কিস্তির জন্য চাপ দেওয়া শুরু করায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কর্মহীন মানুষেরা । অথচ এসব এনজিওদের এমআরএ নির্দেশনা প্রদান করেছে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় রেখে দরিদ্র জনগোষ্ঠির মাঝে জরুরী খাদ্য বিতরণ করার। কিন্তু এখনো পর্যন্ত নিয়ামতপুরে এ সব এনজিও’র কাউকেই জরুরী খাদ্য সহায়তা দিতে কিংবা উপজেলা প্রশাসনকে তাদের খাদ্য বিতরণ কার্যক্রমে অংশ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি।

সরেজমিনে ভাবিচা ইউনিয়নের সিদাইন গ্রামে আশা এনজিও’র কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে ওই এনজিও’র মাঠকর্মী সদস্য রেজাউল, আইনউদ্দিন, কার্ব এনজিও‘র কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় তাদের সদস্য হিরা, তানজিমা, মৌসুমী সংস্থা জিনপুরের কামরু, ফুল মোহাম্মাদ, ছাতড়া সমিতির সদস্য পাইকড়া গ্রামের রাব্বানী এবং ব্র্যাক এনজিও‘র সদস্য সিদাইন গ্রামের আইনউদ্দিন ও রফিকুল ইসলামের কাছ থেকে জোরপূর্বক কিস্তি আদায় করছেন।

সিদাইন গ্রামের রফিকুল ইসলাম, রেজাউল ইসলাম বলেন, আমরা ঢাকায় রিক্সা চালাতাম। রিক্সা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতাম। করোনার কারণে আমরা বাধ্য হয়ে গ্রামে চলে এসেছি। সমস্ত আয় রোজগার বন্ধ। আমরা কিভাবে নিজের এবং স্ত্রী-সন্তানদের পেটে খাবার তুলে দিবো সেই চিন্তাই অস্থির। তার উপর সমিতির লোকেরা কিস্তির জন্য বিভিন্নভাবে চাপ দিচ্ছেন। সারাদিন বাড়ীতে বসে থাকছেন কিস্তি না নিয়ে যাবেন না বলে আমাদের সাথে খারাপ ব্যবহারও করছেন।

শ্রীমন্তপুর ইউনিয়নের ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে আশা এনজিও’র কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে ওই এনজিও’র মাঠকর্মী সদস্যদের কাছ থেকে কিস্তি আদায় করছেন।

এ সময়ে সদস্য অভিযোগ করে বলেন, অসুস্থ্য থাকার কারনে আমি গত সাপ্তাহিক কিস্তি দিতে পারি নাই। কিন্ত মাঠকর্মী সকাল থেকে বিকাল ৩ টা পর্যন্ত আমার ঘরে বসে ছিলেন। এ সময়ে ওই মাঠকর্মী আমাকে নানান কটুকথা বলে মানসিকভাবে হয়রানি করে কিস্তি দেয়ার জন্য। আমি বাধ্য হয়ে পাশের বাড়ির একজনের কাছ থেকে টাকা ধার করে কিস্তি পরিশোধ করি।

গত ২৫ জুন নিয়ামতপুর বাজার ব্যবসায়ী মোখলেছুর রহমান উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগ মোখলেছুর রহমান বলেন, গত ২৪ জুন সন্ধ্যা ৭টায় সানমুন টেইলার্সের ঘরে আরডিআরএস বাংলাদেশ এর ক্ষুদ্রউদ্যোগ কর্মসূচীর (এমই) এর ম্যানেজারসহ ৪জন কর্মীসহ এসে সাথে কিস্তি আদায়ের জন্য গালিগালাজ ও ধস্তাধস্তি করেন। ম্যানেজার হুমকি দিয়ে বলেন, কিস্তি দিতে না পারলে তোর চোখ তুলে নিব।

নিয়ামতপুর অবস্থিত রিক সংস্থার নিয়ামতপুর শাখার মাঠকর্মী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘কাউকে কিস্তি আদায়ে চাপ দেওয়া হচ্ছে না। তবে যারা সেচ্ছায় কিস্তি দিচ্ছেন তা গ্রহণ করা হচ্ছে। এছাড়াও আমি আমার প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা মত কাজ করছি। কিস্তি আদায় না করলে আমরা লোন দেব কিভাবে?

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জয়া মারীয়া পেরেরা বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কিস্তি আদায় বন্ধ রয়েছে। তবে যাদের সামর্থ রয়েছে তাদের কাছে আমার অনুরোধ আপনারা নিয়মিত কিস্তি প্রদান করেন। যদি সবাই একযোগে কিস্তি প্রদান করা বন্ধ করে দেয় তাহলে অর্থ সংস্থানের অভাবে অনেক এনজিও পুনরায় ঋন প্রদান করতে সামর্থ হবেনা। এতে সামনের দিনগুলোতে ঋণ প্রত্যাশী কৃষকগণ বিপদগ্রস্ত হবেন। তাই আমার পরামর্শ যাদের একেবারেই সামর্থ নেই তারা কিস্তি না দিলেও যাদের সামর্থ রয়েছে তারা যেন নিয়মিত কিস্তি প্রদান করেন। সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও জোরপূর্বক কিস্তি আদায়ের চেষ্টা করলে সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ জানালে সংশ্লিষ্ট এনজিওর বিরুদ্ধে ব্যবস্হা নেয়া হবে।

প্রসঙ্গত, ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি’র (এমআরএ) এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সারা দেশে করোনা সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোন গ্রাহক যদি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারেন, তাহলে তাদের ঋণকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলেও ঋণকে নিয়মিত রেখে প্রয়োজনে নতুন ঋণ দিতে হবে।

এই সংবাদটি 174 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ