মহা সত্যের আহবান

প্রকাশিত: ৫:০০ অপরাহ্ণ, জুন ১, ২০২০

মহা সত্যের আহবান

 

আমরা মুসলমান- প্রত্যকেই সতন্ত্রভাবে একেকজন দাঈ। আমাদের জন্য দাওয়াহ’র কাজ কখনো বর্জন করা উচিত নয়। দাওয়াহ হচ্ছে আমাদের জীবন, যে জীবন আমরা বসবাস করি।

আমাদের কার্যপ্রণালি ও কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে চিন্তা করার আগে এই চেতনাই প্রথম তৈরি করতে হবে। তবে আফসোস আমরা এ দিকটাই হারিয়ে ফেলেছি! আমাদের ব্যক্তিগত ও সম্মেলিত/প্রাতিষ্ঠানিক এ চেতনা শূন্যের কোঠায়।

আর এ সুযোগে বিভিন্ন এনজিও সংস্থা বিশেষ করে খ্রিস্টান মিশনারী’রা কখনো ইসলামি পরিভাষা ব্যবহার করতঃ কুরআনের অপব্যাখ্যা করে, আবার কখনো হাসপাতাল স্থাপন, দারিদ্র্য বিমোচন, কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট প্রভৃতি মুখরোচক কর্মসূচীর আড়ালে খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারের নীল নকশা বাস্তবায়ন করেই চলছে- আর এ কাজে তাদের সাফল্য রীতিমত চোখ ধাঁধানো! হ্যাঁ নিঃসন্দেহে এটা আমাদের মুসলমানদের ব্যর্থতার দলিলও।

তাদের এই অগ্রযাত্রা রোধে আমাদের উপর আবশ্যকীয় বিধান ‘দাওয়াহ’ অর্থাৎ আল্লাহর মনোনীত দ্বীন ইসলামের বাণী আল্লাহর বান্দাদের কাছে পৌঁছাতে হবে, অন্যথায় আল্লাহর শাস্তি ভোগ করতে হবে। কেননা কুরআন পাঠের সময় আমরা দেখতে পাই যে, পূর্ববর্তী উম্মতকে বিশেষ করে তিনটি অপরাধের জন্য শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তা নিম্নরূপ:

★তারা অন্যায় কাজে বাধা দিত না [১]
একটু অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে আমরাও একই অপরাধে অপরাধী! কেননা আমরা সবাই জানি সবচেয়ে জঘন্যতম মন্দ কাজ হচ্ছে ‘আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করা’ এবং এর ফল চিরস্থায়ী জাহান্নামের আগুন। একথাটি কী কখনো আমরা কোনো অমুসলিমকে বলেছি?

– বলিনি! অপরদিকে ঠিকই সম্প্রতি আমরা হিন্দুদের মন্দিরগুলোতে পর্যন্ত জীবাণুনাশক স্প্রে করেছি- যাতে তারা ‘করোনায়’ আক্রান্ত না হয়! অস্থায়ী এ দুনিয়ায় আমরা তাদের সুখ দুঃখে পাশে থাকার মত মনমানসিকতা থাকলেও- ভ্রক্ষেপ নেই চিরস্থায়ী পরকালের সুখ দুঃখের প্রতি। আহ! কী অদ্ভুত দয়া বিচিত্র মানবতা(!)

★তারা সত্যকে গোপন করত [২]
এ অপরাধকে যদি একটি রোগ হিশেবে ধরে নেই- নিঃসন্দেহে আমরাও এ রোগে রোগাক্রান্ত! যেমন কুরআনের ভাষ্য, ‘হযরত মোহাম্মদ সা. (মুসলিম-অমুসলিম) সবার নবী এবং কুরআন সবার জন্য পথনির্দেশিকা’ এ কথাগুলো আমরা কখনো কোন অমুসলিমকে বলেছি?
– উত্তর যদি ‘না’ হয়, আমরাও সত্যকে গোপন করলাম কী? হ্যাঁ অবশ্যই সত্যকে গোপন করেছি।

★ তারা আল্লাহ তায়ালার বিধিবিধান এর ব্যাপারে উদাসীন ছিল [৩]

এখন দেখার বিষয় আমরাও কী আল্লাহর বিধিনিষেধ এর ব্যাপারে উদাসীন? আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা ডাকো তোমাদের রবের পথে, হিকমাহ (প্রজ্ঞা ও কৌশল) এবং সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে'[৪]
এই আয়াতে যেহেতু নির্দিষ্ট করে কাকে দাওয়াত দিতে হবে তার বর্ননা নেই,অতএব মুসলিম-অমুসলিম সবাইকে আল্লাহর পথ তথা ইসলামের (অমুসলিমদেরকে ঈমানের আর মুসলিমদেরকে ঈমানের দাবি পূরণের) দাওয়াত দিতে হবে।আর এ বিধান যেহেতু আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক প্রণীত তাই ফুকাহায় কেরাম এ বিধানকে ‘ফরজ’ বলেছেন। তবে তা ‘ফরজে আইন’ না ‘ফরজে কেফায়া’ তা নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও সবাই একমত যে ‘কেউ দাওয়াত না দিলে তা ফরজে আইন’ এবং তা অনাদায়ে সবাই গোনাহগার হবে।

চোখ মেলে একটু তাকিয়ে দেখেন তো আমরা এই বিধান আদায়ে কতটুকু যত্নশীল? যদি নেগেটিভ উত্তর আসে তাহলে পূর্ববর্তীদের মত আমরাও তো একই মামলার আসামি! আর আল্লাহ তায়ালার আদালতের চিরাচরিত মূলনীতি হলো নির্দিষ্ট একই প্রকারের অপরাধের জন্য ঐ একই শাস্তি নির্দিষ্ট।

নবীজির দোয়ার বদৌলতে হয়ত দুনিয়ায় আমরা তেমন বড় কোনো শাস্তির সম্মুখীন হবনা।কিন্তু পরকালের শাস্তি তো আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে!
অতএব আসুন পরকালের কঠিন শাস্তি থেকে নিজেদেরকে বাঁচাতে শরীয়তের অন্যান্য বিধিবিধান গুলো যথাযথ পালন করার সাথে সাথে ‘দাওয়াহ’ নামক বিধানটিও পালনে যত্নবান হই।

দাওয়াহ এর অপরিসীম ফযীলত

★দাওয়াতি কাজের গুরুত্ব ও ফযীলত এত অধিক, যা কোনো মানুষ বাহ্যিক দৃষ্টিতে অনুধাবন না করে থাকতে পারে না! পবিত্র কালামের অসংখ্য আয়াত যার উজ্জ্বল প্রমাণ। আল্লাহ তাআলা বলেন, (তরজমা) ‘ঐ ব্যক্তির কথার চেয়ে ভালো কথা আর কার হতে পারে, যে আল্লাহর প্রতি আহবান করেছে, সৎ কাজ করেছে এবং বলেছে, আমি অনুগতদের একজন?’[৫]

★আবূ মাসউদ উক্ববাহ ইবনু আমর আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ভাল কাজের পথ দেখাবে, সে তার প্রতি আমলকারীর সমান সওয়াব পাবে’ [৬]
সুবহানাল্লাহ! আমাদের দাওয়াতে যদি একজন মানুষও সঠিক পথের সন্ধান পায় এবং এরপর থেকে সে যত আমল করবে- আমরাও তাঁর সমপরিমাণ সওয়াব পেতে থাকব।আর এটাই হয়ে যেতে পারে আমাদের নাজাতের উসিলা।

আমরা কিভাবে দাওয়াত দিব?

(ক) সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে মিশনারীগুলোর অপতৎপরতা জাতির সামনে উপস্থাপন এবং এদেশকে খ্রিস্ট রাজ্য করার তাদের দীর্ঘ মেয়াদি লালিত স্বপ্নকে দুঃস্বপ্ন করার মধ্য দিয়ে, ইসলামের দাওয়াত দেওয়া। অর্থাৎ মিডিয়াকে দাওয়াতি কাজের মাধ্যম হিশেবে ব্যবহার করা।

(খ) প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে মাদ্রাসাসমূহের অধীনে এমন একটি সতন্ত্র বিভাগ চালু করা, যেখানে শুধু অমুসলিমদেরকে দাওয়াহ দেওয়ার কর্মপদ্ধতি শিক্ষার পাশাপাশি তাদের ধর্মীয় শাস্ত্রগুলো নিয়ে গবেষণা ইত্যাদি করা হবে। কেননা একজন অমুসলিমকে আপনি প্রথমেই কুরআন দিয়ে দাওয়াত দিতে চাইলে শুনতেই চাইবে না!

বরং আমাদেরকে তাদের ধর্মীয় শাস্ত্রের আলোকেই দাওয়াহ দিতে হবে। আর প্রতিটি ধর্মেই আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদ এবং শেষ নবীর আগমন এবং তাঁর বৈশিষ্ট্য সমূহের কথা আছে।কিন্তু এগুলো তাদের ধর্মীয় পণ্ডিতরা অন্যদের কাছে প্রকাশ করেনা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য! ঠিক এখান থেকেই আমাদের কাজ শুরু করতে হবে অর্থাৎ এগুলো সবার সামনে উপস্থাপন করতে হবে।
যেমন হিন্দুদের কঠ উপনিষদে আছেঃ
“একং ব্রহ্ম দ্বিতীয়ং নাস্তি,নেহ না নাস্তি কিঞ্চন”[৭]
অর্থ- পরমেশ্বর এক,তিনি ব্যতিত কেহ নেই।

মূর্তিপূজা নিষেধ এই মর্মেও শ্লোক আছে তাদের ধর্মীয় শাস্ত্রে। যেমন
” ন তস্য প্রতিমা অস্তি যশ্য নাম মহদ্যশঃ”[৮]
অর্থ- ঈশ্বরের কোনো প্রতিমা নেই এবং তাঁর সাদৃশ্যও নেই।
এভাবে আরো অনেক শ্লোক আছে যেগুলো চিরাচরিত সত্য এবং ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিকও নয়।

তেমনি খ্রিস্টানদের বাইবেলেও আছে গড (আল্লাহ) শুধু একজনই।এবং যিশু অর্থাৎ ঈসা আ. আল্লাহর প্রেরিত দূত এবং তাঁকে শুধু বনি ইসরাইল জাতির কাছে প্রেরণ করা হয়েছে। যেমন যীশু বলেন “আমাকে শুধু বনি ইসরাইলের হারানো ভেড়াদের কাছেই পাঠানো হয়েছে” [৯]

(গ) সেবার মাধ্যমে মানুষকে ইসলামের আহবান করা। সাত সমুদ্র তের নদীর ওপার থেকে যদি মিশনারীরা এদেশে এসে সেবার আড়ালে একটি বাতিল ধর্মের জন্য ধর্মান্তরের কাজ করতে পারে! আমরা কেন পারবনা আমাদের প্রতিবেশী অমুসলিম ভাইদের মাঝে সেবার মাধ্যমে দাওয়াতী কাজ করতে? আমাদের সম্মেলিত প্রচেষ্টায় প্রতিটি এলাকায় এমন একটি ফান্ড থাকা প্রয়োজন। যার দ্বারা মুসলিম-অমুসলিম সবার সেবা করা যাবে।

(ঘ) আমাদের মধ্যে যাঁরা লেখালেখিতে পারদর্শী তাঁদের জন্য করণীয় হলো- অমুসলিমদের উপযোগী এমন বইপুস্তক লিখে বিতরণ করা। প্রখ্যাত দাঈ মাওলানা কালিম সিদ্দিকী সাহেবের ‘আপকি আমানত আপকি সেওয়া মে’ এর বাংলা ‘আপনার সমীপে আপনার আমানত’ বইটিও দেওয়া যেতে পারে।আর এক্ষেত্রে অবশ্যই আমাদের মুসলিম সমাজের বিত্তবানদেরকে আর্থিক সহায়তা প্রদানে এগিয়ে আসতে হবে।

(ঙ) অমুসলিমদের জন্য হেদায়েতের দোয়া করা।
এবং নিজেকে পাপ মুক্ত রেখে আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করা।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে তাঁর বিধান সমূহ যথাযথ পালনের তৌফিক দান করুক।আমিন।

সুত্র:
[১] সুরা মায়েদা: আয়াত: ৭৯
[২]সুরা বাকারা: আয়াত: ১৫৯
[৩]সুরা আরাফ: আয়াত: ১৬৫
[৪]সুরা নাহল: আয়াত: ১২৫
[৫]হামিম সাজদাহ: আয়াত:৩৩
[৬]সহীহ মুসলিম: হাদীস:১৮৯৩
[৭]কঠ উপনিষদ: ২:১:১১
[৮]যজুর্বেদ: ৩২:৩
[৯]মথি : ১৫:২৪

আমির হোসাইন নাঈম
(এম,এ মাস্টার্স) জামেয়া মদীনাতুল উলূম দারুস্ সালাম,সিলেট।
তারিখ: ০১/০৬/২০২০ ইংরেজি।

 

এই সংবাদটি 1518 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ